সৃজনশীল গাইবান্ধার যাত্রার গল্প

অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ - একটি অনুপ্রেরণার গল্প

২২ এপ্রিল ২০১৯
প্রতিষ্ঠা
তরুণদের
প্ল্যাটফর্ম
সমৃদ্ধ
সমাজ গড়া
সেবা ও
সৃজনশীলতা

ভূমিকা

প্রতিটি জেলার রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরিচিতি। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চল যেমন ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি, সম্পদ ও সম্ভাবনার বাহক, তেমনি গাইবান্ধা জেলার রয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য।

তবে দীর্ঘ সময় ধরে গাইবান্ধার বহুমাত্রিক পরিচয় যথাযথভাবে জাতির সামনে তুলে ধরা হয়নি। অনেকেই এই জেলার নাম জানলেও এর ঐতিহ্য, সম্পদ ও সম্ভাবনার প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে অবহিত ছিল না।

পরিবর্তন আসে জেলা প্রশাসনের এক উদ্যোগের মাধ্যমে। প্রকাশিত হয় "গাইবান্ধা জেলা ব্র্যান্ডিং বুক", যা ছিল জেলার ঐতিহ্য, সম্পদ ও উন্নয়নের এক সংক্ষিপ্ত দলিল। এই বইটি শুধু গাইবান্ধার পরিচিতি নয়, বরং ছিল নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার বাতিঘর। বইটি তরুণদের মনে জাগিয়ে তোলে নতুন স্বপ্ন, নতুন প্রত্যাশা এবং নতুন কর্মপ্রচেষ্টা। আর এই অনুপ্রেরণার ফলেই জন্ম নেয় একটি সংগঠন "সৃজনশীল গাইবান্ধা"

গাইবান্ধা: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সম্ভাবনা

গাইবান্ধা জেলা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ব্রহ্মপুত্র, করতোয়া, তিস্তা, ঘাঘট ও যমুনা নদীর মিলিত প্রবাহে গড়ে ওঠা এই ভূমি প্রাচীনকাল থেকেই উর্বরতার জন্য খ্যাত। কৃষিনির্ভর এ জেলার অর্থনীতি গড়ে উঠেছে ধান, ভুট্টা, সবজি, মরিচ এবং অন্যান্য অর্থকরী ফসলকে কেন্দ্র করে।

তবে গাইবান্ধা শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ নয়। এই জেলার রয়েছে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। লোকগীতি, ভাওয়াইয়া, পালাগান, পুঁথিপাঠ, নাটক ও মেলার মাধ্যমে এখানে শত শত বছর ধরে মানুষের আনন্দ-বিনোদন ও জ্ঞানচর্চা হয়েছে।

কিন্তু এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও গাইবান্ধা দীর্ঘদিন পিছিয়ে ছিল মূলধারার আলোচনায়। দেশের অন্য জেলাগুলো যেখানে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে পরিচিতি পাচ্ছিল, গাইবান্ধা তখনও পুরোপুরি নিজেকে তুলে ধরতে পারেনি।

জেলা ব্র্যান্ডিং বুক: এক নতুন দিগন্ত

গাইবান্ধার পরিচিতি সঠিকভাবে জাতির সামনে তুলে ধরার প্রয়াসে জেলা প্রশাসন এক অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নেয়। তারা প্রণয়ন করে "গাইবান্ধা জেলা ব্র্যান্ডিং বুক"

এই বইয়ে জেলার তিনটি প্রতীকী পণ্যকে ব্র্যান্ড হিসেবে নির্ধারণ করা হয় –

রসমঞ্জুরী

গাইবান্ধার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি, যা বহু প্রজন্ম ধরে মানুষের রসনা তৃপ্তি জুগিয়ে আসছে।

মরিচ

গাইবান্ধার মরিচ দেশের বাজারে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে। এর স্বাদ ও ঝাঁঝ অনন্য।

ভুট্টা

চরাঞ্চলে ভুট্টা চাষ অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটিয়েছে। এ ফসল গাইবান্ধার মানুষের জীবিকা ও উন্নয়নের নতুন পথ খুলে দিয়েছে।

স্বাদে ভরা রসমঞ্জুরীর ঘ্রাণ চরাঞ্চলের ভুট্টা-মরিচ গাইবান্ধার প্রাণ

বইটিতে শুধু এই তিন পণ্য নয়, বরং জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, পর্যটন সম্ভাবনা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। প্রথমবারের মতো গাইবান্ধার জন্য তৈরি হয় একটি ভিজ্যুয়াল পরিচিতি, যা জেলার মানুষকে গর্বিত করে তোলে।

গাইবান্ধার ঐতিহ্যবাহী রসমঞ্জরি
গাইবান্ধা জেলার ব্র্যান্ডিং লোগো
সৃজনশীল গাইবান্ধার কার্যক্রম
ব্র্যান্ডিং বই — সৃজনশীল গাইবান্ধা (PDF)

একটি বই থেকে জন্ম নিল নতুন স্বপ্ন

"গাইবান্ধা জেলা ব্র্যান্ডিং বুক" শুধু একটি সরকারি প্রকাশনা ছিল না। প্রকাশনাটি হয়ে উঠেছিল মেহেদী হাসানের চোখে এক নতুন সম্ভাবনার প্রতীক।

বইটি মেহেদী হাসানের মনে প্রশ্ন জাগায় –

"আমরা কি পারি না নিজেদের প্রচেষ্টায় গাইবান্ধাকে আরও সৃজনশীলভাবে উপস্থাপন করতে?"
"আমরা কি পারি না আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আমাদের জেলার গল্পকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে?"
"আমরা কি পারি না সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও উন্নয়নকে একত্রিত করে গাইবান্ধাকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে?"

এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় নতুন চিন্তা। আর সেই চিন্তা থেকেই বাস্তবায়িত হয় এক স্বপ্ন – "সৃজনশীল গাইবান্ধা"

মোঃ মেহেদী হাসান প্রতিষ্ঠাতা- সৃজনশীল গাইবান্ধা
মোঃ মেহেদী হাসান
প্রতিষ্ঠাতা- সৃজনশীল গাইবান্ধা

সংগঠনের জন্ম: ২০১৯ সালের ২২ এপ্রিল

সংগঠনের প্রাথমিক কার্যক্রম আরো আগে থেকে শুরু হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৯ সালের ২২ এপ্রিল কয়েকজন তরুণ মিলে প্রতিষ্ঠা করেন "সৃজনশীল গাইবান্ধা"। শুরুটা ছিল খুবই ছোট। কিন্তু লক্ষ্য ছিল সুদূরপ্রসারী।

সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল –

জেলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্পদকে সৃজনশীলভাবে তুলে ধরা।
তরুণদের মধ্যে নেতৃত্ব, দক্ষতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তোলা।
গাইবান্ধাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্র্যান্ডেড জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নত করা।

প্রাথমিক উদ্যোগ

সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয় স্থানীয় ঐতিহ্য ও ইতিহাস প্রচারের মাধ্যমে। তারা ফেসবুক ও ডিজিটাল মাধ্যমে জেলার সংস্কৃতি তুলে ধরতে থাকে।

পরে ধীরে ধীরে কার্যক্রম বিস্তৃত হয় –

ডিজিটাল প্রশিক্ষণ কর্মসূচি

তরুণদের গ্রাফিক্স ডিজাইন, কনটেন্ট রাইটিং শেখানো।

সামাজিক সচেতনতা কর্মসূচি

পরিবেশ রক্ষা, বৃক্ষরোপণ, শিক্ষা সহায়তা।

সৃজনশীল ক্যাম্পেইন

জেলার ঐতিহ্যবাহী উৎসব, লোকসংস্কৃতি ও পর্যটনকে প্রচার।

সংগঠনের এই কার্যক্রম তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগায়। তারা বুঝতে পারে, নিজেদের জেলার জন্য কাজ করাই আসল গর্ব ও আনন্দ।

বর্তমান: সৃজনশীলতার প্ল্যাটফর্ম

আজ "সৃজনশীল গাইবান্ধা" শুধু একটি সংগঠন নয়; এটি হয়ে উঠেছে তরুণদের একটি সৃজনশীল প্ল্যাটফর্ম। এখানে একত্রিত হচ্ছে – ছাত্রছাত্রী, চাকরিজীবী, উদ্যোক্তা, সংস্কৃতিকর্মী, সামাজিক কর্মী। সবাই মিলে জেলার উন্নয়ন ও ব্র্যান্ডিংয়ে কাজ করছে।

যুব উন্নয়ন ও নেতৃত্ব
  • তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কর্মশালা, ট্রেনিং ও লিডারশিপ ক্যাম্প।
  • বিতর্ক, সেমিনার ও সাংগঠনিক চর্চার মাধ্যমে নেতৃত্ব গড়ে তোলা।
স্বাস্থ্য ও সচেতনতা
  • SRHR (যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার) বিষয়ক সচেতনতা কর্মশালা।
  • মাসিক স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য ও কিশোরী ক্লাব কার্যক্রম।
  • ফ্রি হেলথ ক্যাম্প আয়োজন।
নারী ও শিশু কল্যাণ
  • বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রচারণা ও কাউন্সেলিং।
  • নারী অধিকার ও ক্ষমতায়নমূলক কার্যক্রম।
  • শিশুদের জন্য পাঠচক্র, সাংস্কৃতিক আসর ও সৃজনশীলতা বিকাশ কর্মসূচি।
শিক্ষা সহায়তা
  • সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের বই, খাতা ও শিক্ষাসামগ্রী প্রদান।
  • একাডেমিক সহায়তা ও লাইব্রেরি কার্যক্রম।
  • পড়াশোনার পাশাপাশি নৈতিকতা ও নাগরিকতা শিক্ষা দেওয়া।
দুর্নীতি বিরোধী কার্যক্রম
  • তথ্য অধিকার (RTI) সচেতনতা কর্মসূচি।
পরিবেশ ও জলবায়ু কার্যক্রম
  • বৃক্ষরোপণ অভিযান, সবুজায়ন কর্মসূচি ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ।
  • বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান।
  • জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে সচেতনতা সেশন।

সংক্ষেপ

সৃজনশীল গাইবান্ধা আজ একটি তরুণ-চালিত, প্রাণবন্ত ও মানবিক সংগঠন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী ও শিশু কল্যাণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ, পরিবেশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা– সবখানেই সংগঠনের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। লক্ষ্য একটাই– "আলোকিত গাইবান্ধা গড়া, যেখানে সবাই পাবে সমান সুযোগ, মর্যাদা ও সম্ভাবনার জায়গা।"

এইভাবে "সৃজনশীল গাইবান্ধা" জেলার উন্নয়নকে তরুণ প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়েছে।

ভবিষ্যৎ: গাইবান্ধার স্বপ্ন

ভবিষ্যতে "সৃজনশীল গাইবান্ধা" আরও বড় স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চায়।

ব্র্যান্ড জেলা প্রতিষ্ঠা

গাইবান্ধাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্র্যান্ড জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

বিশ্বব্যাপী প্রচার

জেলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্পদকে বিশ্বে প্রচার করা।

উদ্যোক্তা তৈরি

তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা তৈরি করা।

প্রযুক্তির ব্যবহার

আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পর্যটন ও কৃষিতে উন্নয়ন ঘটানো।

শেষ কথা

একটি বই থেকে জন্ম নেওয়া অনুপ্রেরণা আজ একটি আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। "গাইবান্ধা জেলা ব্র্যান্ডিং বুক" তরুণদের চোখে যে আলো জ্বালিয়েছিল, সেটি আজ "সৃজনশীল গাইবান্ধা"র কার্যক্রমে প্রতিফলিত হচ্ছে।

প্রেরণার গল্প

একদল স্বপ্নবান তরুণের হাত ধরে জন্ম নিয়েছিল "সৃজনশীল গাইবান্ধা"। ছোট্ট শহর, সীমিত সুযোগ– সুবিধার মাঝেও তারা ভেবেছিল– পরিবর্তন সম্ভব, যদি আমরা সবাই মিলে চাই। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, নারী ও শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া আর সেবার মানসিকতা– এই সবকিছুই হয়ে উঠেছিল তাদের প্রেরণার মশাল। প্রতিটি উদ্যোগে ছিল স্বেচ্ছাশ্রম, ছিল মানুষের ভালোবাসা, আর ছিল একটি বিশ্বাস– "নিঃস্বার্থ সেবা দিয়েই তৈরি হবে আলোকিত সমাজ।"

সম্ভাবনার গল্প

সৃজনশীল গাইবান্ধার প্রতিটি কার্যক্রম যেন একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। কখনো তা বৃক্ষরোপণ, কখনো রক্তদানের আহ্বান, আবার কখনো কিশোর-কিশোরীদের জন্য স্বাস্থ্য ও সচেতনতা কর্মশালা। সংগঠনের স্বপ্ন– গাইবান্ধাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া যেখানে তরুণরা হবে উন্নয়নের চালিকাশক্তি, যেখানে প্রতিটি নারী পাবে নিজের মর্যাদা, আর শিশুরা পাবে নিরাপদ ভবিষ্যৎ। একেকটি ক্ষুদ্র উদ্যোগই প্রমাণ করে, ছোট প্রচেষ্টা বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

ভবিষ্যতের গল্প

আগামী দিনের স্বপ্ন আরও বিস্তৃত। সৃজনশীল গাইবান্ধা চায়– একটি জ্ঞানভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত, টেকসই ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তুলতে। যেখানে যুবক-যুবতীরা শুধু স্বপ্ন দেখবেই না, বরং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবে। প্রযুক্তির ব্যবহার, সৃজনশীল চিন্তাধারা, আর স্বেচ্ছাসেবার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সংগঠনটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তৈরি করতে চায় এক আলোকিত গাইবান্ধা।

প্রেরণার গল্প, সম্ভাবনার গল্প, ভবিষ্যতের গল্প– সব মিলেই আমরা সৃজনশীল গাইবান্ধা।

একটি বইয়ের অনুপ্রেরণা প্রমাণ করেছে – "তরুণদের হাতেই পরিবর্তনের শক্তি, আর সেই শক্তিই গাইবান্ধাকে নিয়ে যাবে নতুন উচ্চতায়"।